রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গতকাল পুরনো আলু বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ৭৫ টাকার বেশি দামে। আর দেশী জাতের নতুন আলুর দাম আরো বেশি। প্রতি বছরই নভেম্বরে বাজারে নতুন আলু আসার ও ঠিক এর আগমুহূর্তে কৃষিপণ্যটির দাম কিছুটা বাড়তে দেখা যায়। তবে পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম পুরনো আলুর দাম কেজিতে ৭৫ টাকা ছাড়িয়েছে। এক বছর আগে ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর বাজারে আলুর কেজিপ্রতি মূল্য ছিল ৫০ টাকার মধ্যে।
দাম বাড়তি থাকলেও কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে চাহিদার তুলনায় আলুর উৎপাদন অনেক বেশি। তথ্যটি অতিরঞ্জিত উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে এখন আলুর সরবরাহ সংকট রয়েছে। আবার হিমাগার পর্যায়েও দাম বাড়ানো হয়েছে। এর পাশাপাশি বাজারে বিভিন্ন সবজি ও ডিমের দামে অস্থিতিশীলতাও আলুর দামে প্রভাব ফেলেছে। তবে দেশী ও আমদানীকৃত আলুর দাম কোনো অবস্থায়ই ৩৫-৪০ টাকার বেশি হওয়ায় কথা না। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে এখন ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের কারসাজিকেও দায়ী করছেন অনেকে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত বছরের ২৩ নভেম্বর দেশের বাজারে আলুর দাম ছিল প্রতি কেজি ৪৫-৫০ টাকার মতো। এর এক বছর আগে ২০২২ সালের একই দিনে বাজারে কৃষিপণ্যটির সর্বোচ্চ মূল্য ছিল ২৫ টাকা। আগের বছরের (২০২১ সাল) ২৩ নভেম্বর প্রতি কেজি আলুর দাম ছিল ২৫ টাকা। ২০২০ সালের একই সময়ে দেশে আলুর দাম ছিল প্রতি কেজি ৫০ টাকা। সে বছর করোনার প্রভাবে দাম বেড়েছিল। সার্বিক হিসাবে গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম প্রতি কেজি আলুর দাম ৭৫ টাকা ছাড়িয়ে গেল।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রতি কেজি আলুর দাম কোনো অবস্থাতেই ৩৫-৪০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোল্ড স্টোরেজে রাখা আলুর দাম প্রতি কেজি ৩০-৩৫ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। আর আমদানি করলেও কোনোভাবেই ৪০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। কিন্তু ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা আঁতাত করে এবার দাম বেশি বাড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ এবার আলুর সরবরাহ সংকট ছিল। আলুর উৎপাদনের তথ্য অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। তাছাড়া অন্য সব সবজি এবং ডিমের দাম বেশি থাকায় আলুর দামও কিছুটা বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের কারসাজি রুখতে সরকারে কোনো উদ্যোগই কার্যকর ছিল না।’ তবে আগামী মাসে বাজারে নতুন আলু এলে দাম কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলুর সর্বোচ্চ বার্ষিক চাহিদা ৮০ লাখ টন। আর বিবিএসের হিসাব মতে, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৬ লাখ টনের কিছু বেশি, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় দুই লাখ টন বেশি। ফলে চাহিদা মিটিয়ে আলু উদ্বৃত্ত থাকার কথা ২৬ লাখ টনের বেশি। কিন্তু উল্টো আলু আমদানি করতে হচ্ছে।
আলু উৎপাদনের তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন হিমাগার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারাও। পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির পেছনে নিজেদের দায় অস্বীকার করে সংগঠনটির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের হিসাবে দেশে আলুর সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ৭০-৭৫ লাখ টন। এর পরও আমাদের স্টোরেজ ২০ শতাংশ পর্যন্ত খালি ছিল। তাই এবার বাজারে আলুর সংকট আছে। সেটার সুযোগে মজুদদাররা দাম বাড়িয়েছে। আমরা শুধু স্টোরেজ মালিক হিসেবে ভাড়া আদায় করে থাকি। এখানে আলু মজুদ করে ব্যবসায়ীরা, আমরা না। কেজিতে ৫-৬ টাকা ভাড়া পাই আমরা। কিন্তু এবার কৃষক পর্যায়েই আলুর দামে ১০-২০ টাকা লাভ করেছে। কৃষকদের উৎপাদন আগ্রহ বাড়ায় বীজ আলুর সংকটও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আলুর দাম ৪০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। দাম নিয়ন্ত্রণে আমরা সরকারকে ১০ লাখ টন আলুর মজুদ রাখার পরামর্শ দিয়েছিলাম। তাহলে অস্থিতিশীলতার মুহূর্তে সরকার বাজারে আলু ছেড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’
মূলত উৎপাদন তথ্যের হেরফেরের কারণেই দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় সরবরাহ সংকট হলেই বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। আমাদের দেশে আলুর প্রকৃত চাহিদা কত, তা আমরা জানি না। এমনকি উৎপাদনের তথ্যের মধ্যেও সমস্যা আছে। তথ্য ঠিক না হলে সমস্যাও সমাধান হবে না। ঘরের পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং ফাস্টফুডেও আলুর ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তাই আগামীতে আলুর উৎপাদন অনেক বাড়াতে হবে এবং চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনে আমদানি জোরদার করতে হবে। এখন সেভাবে আমদানিও হচ্ছে না।’
স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের দিক থেকে চালের পরই আলুর অবস্থান। বর্তমানে বৈশ্বিক আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। তারপরও দেশে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মূল্য অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া পণ্যগুলোর অন্যতম আলু। গত বছরেও পণ্যটির মূল্যে দেখা গেছে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা। এ বছরও নানা পদক্ষেপের পরও বাজার নিয়ন্ত্রণে না আসায় এক পর্যায়ে খোলাবাজারে আলু বিক্রির উদ্যোগ নেয় সরকার। আলু আমদানিতে শুল্কহারও ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনুমতি দিলেও এখন পর্যন্ত আলু আমদানির পরিমাণ খুব বেশি না এবং বাজারে এর কোনো প্রভাবও দেখা যাচ্ছে না।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ মৌসুমে আলুর কেজিপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ছিল ১০ টাকা ৫১ পয়সা। গত অর্থবছরের উৎপাদন ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ না হলেও সেখানে এ ব্যয়ে খুব একটা হেরফের হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু সে আলুর দাম এখন উৎপাদন খরচের কয়েক গুণ বেশি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মোহা. সেলিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে আলুর কিছুটা সরবরাহ ঘাটতি থাকায় আমার শুল্কছাড় দিয়ে আমদানির অনুমতি দিয়েছি। কিন্তু খুব বেশি আলু আমদানি হচ্ছে না। আমরা ব্যবসায়ীদের আমদানি করতে উৎসাহিত করছি। কিন্তু ভারতেও আলুর দাম কিছুটা বেড়েছে। কলকাতায় দেখলাম রফতানি বন্ধ করা হয়েছে। তাদেরও আলুর সংকট দেখা দিয়েছে। তাই সেভাবে আমদানি হচ্ছে না। আর দাম নিয়ন্ত্রণে আমরা কোল্ড স্টোরেজ পর্যায়ে মূল্য নিরীক্ষার জন্য ভোক্তা অধিদপ্তরকে বলেছি। জেলায় জেলায় টাস্কফোর্স এ বিষয়ে কাজ করবে। তাছাড়া নতুন আলুও বাজারে আসছে। ফলে আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে দাম কমে আসবে।’